বাংলাদেশে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবের স্তর এবং শ্রেণীসমূহের ভেতরকার অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব
লিখেছেন: মনজুরুল হক

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ; মানব মুক্তির পথ
আগের লেখায় (দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গে মার্কসীয় ব্যাখ্যা এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতি) হেগেল
এবং ফয়েরবাখের ভাববাদী দর্শন এবং দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সেই
দর্শন থেকে কিভাবে মার্কসের বস্তুবাদ এবং দ্বন্দ্বাত্মক বস্তুবাদের বিকাশ
সেটাও আলোচিত হয়েছিল। বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যাবার পর বিশেষ করে রাশিয়ায়
বলশেভিক বিপ্লবের পর মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদেরও গুণগত পরিবর্তন
এসেছে। নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে দ্বন্দ্বের বিকাশ এবং দ্বন্দ্বের বিভিন্ন
দিক উন্মোচিত হয়েছে। আরো পরে চীনের বিপ্লব সম্পন্ন হলে বিশ্ব পুঁজিবাদ, সর্বহারা শ্রেণী, সর্বহারা শ্রেণীর শত্রু-মিত্র, কৃষি সমস্যা, সাম্রাজ্যবাদের
হুমকি ইত্যাদি বিষয়গুলি সামনে চলে আসায় দ্বন্দ্বের বিভিন্ন দিক নতুন করে
ভাবতে হয়েছে। নতুন সারসংকলন করতে হয়েছে এবং সেটি করেছেন মাও সেতুং। চীন
বিপ্লবের সময়ই মাও ‘দ্বন্দ্বের নিয়ম’কে দ্বন্দ্ববাদের মূল নিয়ম হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করেন। ইতিপূর্বে তিনটি, চারটি
বা পাঁচটি নিয়মকে দ্বন্দ্বের মূল নিয়ম বলে চিহ্নিত করা হতো। তিনিই প্রথম
উল্লেখ করেন ‘দুয়ে মিলে এক’ একটি সমন্বয়বাদী ধারা। এই দার্শনিক ব্যাখ্যাকে
তিনি খণ্ডন করেন ‘এক দুয়ে বিভক্ত হয়’ এই তত্ত্ব দিয়ে। এর সাথে যুক্তভাবে
‘সংশ্লেষণ’ সম্পর্কিত ধারণাকেও তিনি বিকশিত করেন। তিনি দ্বন্দ্বে নতুন
ব্যাখ্যা দেন- ‘দ্বন্দ্বে সার্বজনীনতা ও বিশিষ্টতা, প্রধান দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্বে বৈরিতা ও অভেদ’। মার্কসীয় জ্ঞানতত্ত্বকে তিনি সমৃদ্ধ করেন- সকল জ্ঞানের মূল উৎস হিসেবে অনুশীলনকে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে; একই
সাথে বস্তু ও চেতনার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন জ্ঞানের
দ্বন্দ্ববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর কোনোটিই একাডেমিক বা পণ্ডিতি আলোচনা
ছিল না। বরং বাস্তব বিপ্লবী সংগ্রাম ও শ্রেণী সংগ্রামের অভিজ্ঞতার
ভিত্তিতেই ও তাকে সেবা করার জন্যই তিনি এগুলো আবিষ্কার করেন, যা বিপ্লবী অনুশীলনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।
আমরা এবার আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থায় প্রধান দ্বন্দ্ব কি, দ্বন্দ্বের প্রধান দিক কি, সার্বজনীনতা কি বা বিশিষ্টতা কি সেই আলোনায় যাব।
বিশ্ব বাজার ব্যবস্থার অধীনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ এখর আর কোনো ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নয়া কৌশলে সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ অর্থনৈতিকভাবে এখন আর কোনো রাষ্ট্রকে স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতায় রাখেনি। তাই জাতীয় বুর্জোয়ার সাথে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। শাসক শ্রেণীর সাথে ব্যাপক জনগোষ্ঠির দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। শাসক গোষ্ঠির একাংশের সাথে ক্ষমতাবান অন্য অংশের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এর সাথে আছে গ্রামীণ ধনী কৃষকের সাথে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের দ্বন্দ্ব, ক্ষুদে কৃষকের সাথে জোতদারের দ্বন্দ্ব, গ্রাম্য জোতদার-ভূমিমালিকদের সাথে শহুরে শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদীদের সাথে স্থায়ী-সাময়ীক শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, কৃষি নির্ভর শ্রেণীর সাথে শহুরে ব্যবসায়ী, লুম্পেন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির সাথে নেতৃত্বদানকারী বৃহৎ জাতিগোষ্ঠির দ্বন্দ্ব, শিক্ষিত মদ্যবিত্ত শ্রেণীর সাথে অশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং ভাসমান জনগোষ্টির সাথে ক্ষুদে মালিকদের দ্বন্দ্ব। এই সব দ্বন্দ্বের মীমাংসার ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তব অবস্থার নিরীখে প্রধান দ্বন্দ্ব কোনটি?
নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক অবহেলিত, অত্যাচারিত, নিপীড়িত শ্রেণীর দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে প্রধান দিক হচ্ছে, যেহেতু শাসক শ্রেণী দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠির একাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং শাসকশ্রেণীর দু‘টি বা তিনটি রাজনৈতিক দল সেই প্রতিনিধি, তাই শাসক শ্রেণীর বাইরের বিশাল জনগোষ্ঠির মুক্তিই আশু লক্ষ্য। এখন পর্যন্ত যে মুক্তির অনুশীলন দেখা যায় নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর এক অংশ থেকে আর এক অংশে পুনঃস্থাপনে। এই সঙ্ঘবদ্ধ শাসকশ্রেণীকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে নির্বাচনই এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষেধক মনে করা হয়, যা শাসকশ্রেণীকে উচ্ছেদ তো করেই না, বরং এক রঙের শেণী থেকে আর এক রঙের শ্রেণীর খপ্পরে গিয়ে পড়ে শাসিত জনগণ। কেবলমাত্র ব্যাপক সহিংস বিপ্লবই পারে এই জনগণকে মুক্তি দিতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই কাজটি কারা করবে? কিভাবে করবে? কোন শ্রেণীর নেতৃত্বে কোন কোন শ্রেণীর সমন্বয়ে করবে?
In : বিশ্লেষন