বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি
লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম
ভারতীয়
উপমহাদেশে সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হয় ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকদের হাত ধরে।
মূলত কোম্পানি ও রাণীর শাসন মিলিয়ে পুরো সময়জুড়ে সিপাহী বিপ্লব, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ প্রভৃতি থেকে শুরু করে আরো বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেক্ষিতে শাসক গোষ্ঠী বুঝতে পারে যে কেবল নিপীড়ন চালিয়ে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ভূমিস্বার্থকেন্দ্রিক একটি দালাল গোষ্ঠী তৈরি করে এই বিশাল ভূ-খণ্ডের সকল জনগণের ওপর দীর্ঘ শাসন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এই চিন্তা থেকেই তারা নিজেদের দেশীয় আদলে এই ভূ-খণ্ডেও
সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয় এবং ১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয়
কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় একজন অগ্রণী ব্যক্তি
হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বৃটিশ সরকারের আমলা অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম।
তিনি কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড
ডুফেরিনকে লেখা পত্রে উল্লেখ করেন যে দীর্ঘদিনের বৃটিশ শাসন-শোষণের
প্রেক্ষিতে জনসাধারণের মধ্যে যে ক্ষোভের বাষ্প পুঞ্জীভূত হয়েছে সেটিকে
নির্গত হতে দেয়ার জন্য তাদের অন্তরে ক্ষমতা প্রয়োগের একটি প্রপঞ্চ তৈরি করা
প্রয়োজন এবং কংগ্রেসের মতো একটি রাজনৈতিক দল গঠন ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে
তা অধিক সফলতার সাথে সুসম্পন্ন হতে পারে না। (“A
safety valve for the escape of great and growing forces generated by
our own action, was urgently needed and no more efficacious safety valve
than our Congress movement could possibly be devised”.)
এ পন্থাতেই তাদের ভেতর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বাষ্পের আকারে নির্গমণের পথ পাবে বলে সর্বজনাব হিউম ধারণা পোষণ করেন। জনগণ যাতে মনে করেন দেশের শাসক নির্বাচনে তাদের একটা ভূমিকা রয়েছে এবং ভোট প্রদানের মাধ্যমে তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম- এমন একটা আবহ তৈরি করে শাসন-শোষণের পথ নিষ্কণ্টক রাখার প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকেই সর্বভারতীয় কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই সেখানকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানো হয়। অন্যদিকে অভিন্ন কারণে সাম্প্রদায়িক তাগিদ থেকে বিংশ শতাব্দের গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে উচ্চ বংশীয় মুসলমান সামন্ত শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। বৃটিশ-ভারতীয় শাসক গোষ্ঠী এই দুটি রাজনৈতিক দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেই জনগণকে দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক বৃত্তে আটকে রাখার প্রয়াস লাভ করে। কিন্তু নানকার বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, টংক বিদ্রোহ সহ সন্ত্রাসবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের ফলে এবং কংগ্রেস-মুসলিম লীগ দলের আন্দোলন-সংগ্রামও কিছুটা জাতীয়তাবাদী রূপ লাভ করায় বিভিন্ন জটিল ঘটনার প্রেক্ষাপটে বৃটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত ভারতকে দুইটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের হাতে তাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় গ্রহণ করে। এসব ঘটনা সবারই জানা।
ওপরে অতি সংক্ষেপে এই জানা ঘটনাগুলো উল্লেখের কারণ হলো ভারতের বিশেষ পরিস্থিতিতে এখানে সংসদীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিতটি সহজে বুঝতে পারা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন শোষণ-নির্যাতনমূলক ব্যবস্থার অনিবার্য ফলস্বরূপ দুর্ভিক্ষ, অনাহার, গণমৃত্যু, লুণ্ঠন প্রভৃতি জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ-বিক্ষোভের সঞ্চার করে তা অচিরেই কিছুটা সংগঠিত রূপ লাভ করে তাদের শাসনের ভিত্তিমূলকে আঘাত করতে শুরু করে। কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি শাসনভার নিয়েও এই সঙ্কট সামাল দেয়া সম্পূর্ণরূপে সম্ভব হয় নি। তখন তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি হয় যে, জনগণকে ক্ষমতা চর্চার কিছুটা স্বাদ দেয়া প্রয়োজন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে যদি তাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভকে একটি আধারে ধারণ করা সম্ভব হয় তাহলে শাসনের কাজ সহজ ও অনেকাংশে নির্বিঘ্ন হবে। উৎপাদন-সম্পর্কের মূল কাঠামোকে অক্ষত রেখে, শ্রেণী শাসনের অধীনে জনগণকে পদানত করে তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন থেকেই কংগ্রেস-মুসলিম লীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক দল এবং সাধারণভাবে সংসদীয় রাজনীতির ভিত্তি ভারতবর্ষে স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে নানকার বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন সহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি বিশেষ প্রবণতা অভিমুখে ঘনীভূত হওয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রভৃতি বৃটিশ সরকারকে উপমহাদেশ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য করলেও তারা দেশ শাসনের ভার রেখে যায় নিজেদের সৃষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে। ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে যে সংসদীয় রাজনীতির দেখা আমরা পাই তা বৃটিশ শাসক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থারই উত্তরাধিকার।
ঔপনিবেশিক বৃটিশ সরকার প্রণীত এই ব্যবস্থা যে শ্রেণী শাসন বজায় রাখতে এ পর্যন্ত মোটামুটি সক্ষম হয়েছে সেটা এর ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়। এই উপমহাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলই সংসদীয় ব্যবস্থা ব্যতীত অন্য উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয় নি। একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারত নেপাল, যেখানে একীভূত নেপালী কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-এর নেতৃত্বে সে দেশে জনগণের বিপ্লবী শক্তি ২০০৬ সালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল অন্যান্য দেশের তুলনায় নেপালে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় অপেক্ষাকৃত অনেক পরে, ১৯৯০ সালে। সে দেশের জনগণের সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা ও অভ্যস্থতাও তুলনামূলক নবীন। সে কারণে নেপালী কংগ্রেস কিংবা সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টির জনভিত্তি সেখানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। জনগণ তাদেরকে সামন্তবাদের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন। এই সুযোগে পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ড‘র নেতৃত্বে ক্রমশ শক্তি অর্জনের মাধ্যমে ২০০৬ সালে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে সে দেশের সামন্তীয় শাসক গোষ্ঠী মাওবাদীদেরকে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে আসতে বাধ্য করে। সাম্রাজ্যবাদের অধীনে পরিচালিত নির্বাচনে জয়লাভ করলেও এর অনিবার্য ফলস্বরূপ সংগঠনটি অচিরেই অন্যান্য সংসদীয় দলের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আমলাতান্ত্রিকতা-নির্ভর সংগঠনে পরিণত হয়ে সে দেশের বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী জনগণের আস্থা হতে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে সহ-সভাপতি মোহন বৈদ্য কিরণের নেতৃত্বে ২০১২ সালে দলটির ভাঙন সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি নেপালী কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) অন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন।
কিন্তু ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তাদের রাষ্ট্রগঠনের প্রথম থেকেই শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে সংসদীয় রাজনৈতিক কাঠামোকে। এর মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই সেখানে সংসদীয় নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি বিঘ্নিত হয়ে এসেছে উপর্যুপরি সামরিক শাসকদের পদাঘাতে। এর কারণ মূলত বৃটিশ পাক-ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের মধ্যেই সন্ধান করতে হবে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যে সামন্তীয়-বুর্জোয়া শ্রেণীর বিশেষ অংশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সংগঠিত করেছিল তাদের অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল ভারতীয় বড় পুঁজির প্রতিনিধিদের অনেক পরে। তাছাড়া এই বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব সরাসরি ধর্মকে সামনে নিয়ে আসায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা এখানে পরিপক্বতা লাভ করার সুযোগ পায় নি। যার ফলে দেখা যায়, শাসক দলগুলোর দুর্নীতির সুযোগে এবং ধর্মের নাম নিয়ে সামরিক বাহিনী বারবারই সেখানে ক্ষমতা দখল করেছে তাদের শ্রেণী শাসন অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিপক্বতাজনিত সঙ্কট এর জন্য দায়ী। বর্তমানে সেখানে একটি ভঙ্গুর সংসদীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও তার খুঁটি হিসেবে কাজ করছে বহিঃস্থ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।
তবে ভারতে এই সংসদীয় ব্যবস্থা বেশ পোক্তরূপেই এখন পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই তাদের সে ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয় নি। বরং ২৮ টি অঙ্গরাজ্যে বিভক্ত এই রাষ্ট্রের লোকসভা ও রাজ্যসভা নির্বাচন নিয়ম মেনেই নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে এবং এর মাধ্যমে রাজ্যগুলোতে ও কেন্দ্রে সরকারও পরিবর্তন হচ্ছে। এর অর্থ অবশ্য এটা নয় যে সেখানে শাসক শ্রেণীর মধ্যে দুর্নীতি নেই, তাদের শ্রেণীগত কোনো সঙ্কট নেই। কিন্তু স্বীয় পরিপক্বতার বদৌলতে তারা সেই সঙ্কট এখনো পর্যন্ত পার হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে এবং সঙ্কটকে নাগালের বাইরে যেতে দ্যায় নি। সম্প্রতি ব্যাপক দুর্নীতির প্রেক্ষিতে সেখানকার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের বীতশ্রদ্ধার সুযোগে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে আম আদমি নামক এক নতুন পার্টির উত্থান ঘটেছে। মূলত আন্না হাজারের দুর্নীতি-বিরোধী অনশন কর্মসূচির জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই রাজনীতির বাজারে তাদের বাণিজ্য চাঙ্গা হওয়ার পথে। কিন্তু এই দুর্নীতি-বিরোধিতার প্রশ্নে তার উৎসমূলের সন্ধান কিংবা রাষ্ট্রকাঠামোকে জনগণের আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্যই অক্টোভিয়ান হিউম-কথিত ‘সেফটি ভালভ’ হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনে দেশটির রাজনৈতিক মঞ্চে দলটির আবির্ভাব ঘটেছে। এভাবে ঔপনিবেশিক আমলের শাসনকাঠামো, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখেই বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে কিছু লোক দেখানো সংস্কার সাধন করে নিজেদের শ্রেণী শাসন অব্যাহত রাখার পুঁজিবাদী তাগিদেই ভারতে আম আদমির জয়জয়কার, তাদের উত্থানে উল্লসিত হওয়া বিভ্রান্ত লোকজনের অভাবও সেখানে নেই।
তবে এদিক থেকে বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর অবস্থা অনেক শোচনীয়। ১৯৭২ সালে এই নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই এখানে যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চা বলতেও কিছু থাকবে না এটা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংবিধান সভার সদস্যদের নিয়ে স্বাধীন দেশের সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরবর্তীতে এটা আরো ভালোভাবে প্রমাণিত হয় ১৯৭৩ সালে ব্যাপক কারচুপির নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের ব্যালট ছিনতাইয়ের পর গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর “দেশে কোনো বিরোধী দল নেই”- এই দম্ভোক্তি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। আর ১৯৭৫ সালের প্রারম্ভেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ঘোষণার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্পন্ন হয়েছিল সরকারবিরোধী সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে।
In : বিশ্লেষন